২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ইং, ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ


রোহিঙ্গা শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দিন

সম্প্রতি মিয়ানমার হইতে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এই পর্যন্ত তিন লক্ষ ৭০ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের অব্যাহত নিপীড়ন এবং দেশত্যাগের ফলে সবচাইতে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়িয়াছে শিশু ও নারীরা। এখন অবধি প্রায় এক হাজার ১২৮টি পরিবার-বিচ্ছিন্ন শিশুর সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সহিত পাল্লা দিয়া প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাইতেছে এই সংখ্যা। এইসব পরিবার-বিচ্ছিন্ন শিশুকে লইয়া ইউনিসেফ সবচাইতে বেশি উদ্বিগ্ন। ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা প্রধান জ্যঁ লিবে গত মঙ্গলবার জানাইয়াছেন যে, কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় পাওয়া বিপুল সংখ্যক শিশু বহুদিন ঠিকমতো ঘুমাইতে পারে নাই। তাহারা ক্ষুধার্ত ও দুর্বল। রাখাইন হইতে দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়া বাংলাদেশে আসিতে গিয়া তাহাদের অনেকেই অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে। চোখের সামনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিপুল ধ্বংসলীলা, খুন, ধর্ষণ এবং নিপীড়ন দেখিয়া শিশুরা মানসিকভাবেও ভয়ানক বিপর্যস্ত অবস্থায় রহিয়াছে। এই জন্য শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাহাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা সেবাও এখন দরকার। সব মিলাইয়া প্রায় দুই লক্ষ শিশুর জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।

এই যে মানবিক সংকটের পুরোভাগে রহিয়াছে নিষ্পাপ শিশুরা, ইহার অধিক লজ্জার ঘটনা আর কী হইতে পারে? বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই মানবিক সংকট ক্রমশ বৃহত্ আকার ধারণ করিতেছে। দেখা গিয়াছে, ক্যাম্পগুলিতে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারীও রহিয়াছে। বাংলাদেশে আসিবার পথেও অনেক মা সন্তান প্রসব করিয়াছেন। শরণার্থীদের ঢল না থামিবার ফলে ক্যাম্পের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাইতেছে দিন দিন। তাহার ফলে এইসব ক্যাম্পে ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিরাপদ খাবার পানির সংকট বাড়িয়াই চলিতেছে। মনে রাখিতে হইবে, বিশ্বের সকল মানবাধিকারই শিশুদের জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু যেহেতু শিশুদের অতিরিক্ত মনোযোগ ও নিরাপত্তা প্রয়োজন, সেই কারণে তাহাদের জন্য স্বতন্ত্র একটি শিশু অধিকার সনদও রহিয়াছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে বলা হইয়াছে—শিশু অবস্থায় মানুষ তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তাই তাহাদের চাহিদা বয়স্কদের চাহিদা হইতে আলাদা। অনেক সময় শিশুদের সম্পূর্ণ মানুষ হিসাবেও ভাবা হয় না। এই সমস্যার বাহিরে নহে রোহিঙ্গা শিশুরাও।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা বৃদ্ধ, শিশু ও নারীরা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রহিয়াছেন সবচাইতে বেশি। স্পষ্টতই বিপুল পরিমাণ এই শরণার্থীর ঢল সামলাইতে হিমশিম খাইতেছে স্থানীয় প্রশাসন। সার্বিকভাবে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াইতে ক্যাম্পগুলিতে সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন উচ্চমানের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। ইউনিসেফ জানাইয়াছে, ইহার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন ৭৩ লক্ষ ডলার। মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দিয়াছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি। রোহিঙ্গা বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের প্রতি মানবিক ভূমিকা পালনের সুযোগ ও দায়িত্ব রহিয়াছে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও কল্যাণকারী রাষ্ট্রসমূহেরও।